দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিসিএস ক্যাডার মাহবুবুর রহমানের গল্প

মাহবুবুর রহমান, ৩৪তম বিসিএস। চোখে আলো নেই, তবে মনের আলো আর মনের জোরে হয়েছেন বিসিএস ক্যাডার,

সেইসাথে নরওয়ের অসলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ৩৪তম বিসিএসে মাহবুবুর রহমানের সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়ার গল্পটাও অনন্য।

মাহবুবুর রহমান দেশের প্রথম দৃষ্টিপ্রতি;বন্ধী বিসিএস ক্যাডার। বর্তমানে সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর মতো যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তাদেরকে এগিয়ে নিতে গড়ে তুলেছেন সাংস্কৃতিক সংগঠন গঙ্গাপদ্মা শিল্পীগোষ্ঠী। দৈনিক প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার জীবনের অনন্য বাস্তব গল্পটা।

আপনার পেশাগত জীবন কেমন চলছে?
মাহবুবুর রহমান: আমি ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কাজ করছি। এর মাঝে শিক্ষাছুটিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেখানকার বোস্টন কলেজে পাঠক্রম শিক্ষাদান বিষয়ে এমএড সম্পন্ন করেছি।

এটি আপনার প্রথম কর্মক্ষেত্র?
মাহবুবুর রহমান: আমার প্রথম চাকরি ছিল স্নাতকোত্তর শেষ করার পর। তখন সহযোগী শিক্ষক হিসেবে সরকারি প্রকল্পের অধীনে সিলেটের গোয়াইনঘাটের একটি স্কুলে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর তো বিসিএস হলো।

বিসিএস দিতে গিয়ে কেমন অভিজ্ঞতা হলো?
মাহবুবুর রহমান: স্নাতকের শেষ দিকেই নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। BCS-এর প্রস্তুতিও চলছিল। আমি ৩৪তম বিসিএসে অংশ নিয়েছিলাম।

অনেক আন্দোলনের পর ৩২তম BCS থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন, কিন্তু কেউ চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি। ৩৪ম BCS প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় আমরা ২০-২৫ জন অংশ নিয়েছিলাম। শ্রুতলেখকের সহায়তায় পরীক্ষা দিলাম।

লিখিত পরীক্ষা শেষে আমরা ৪জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ভাইভার জন্য ডাক পেয়েছিলাম। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে BCS ক্যাডার হিসেবে আমিই প্রথম নিয়োগ পেলাম।

এর মধ্যেই নরওয়ে থেকে ডাক এল। যে দিন ৩৪তম BCS-এর সাক্ষাৎকার দিয়ে আসি, সেদিন রাতেই Norway-এর ইউনিভার্সিটি অব অসলো থেকে একটি e-mail পাই। তারা জানায়, আমি এমফিল করার সুযোগ পেয়েছি।

আমি একধরনের দোটানায় পড়ে যাই। যেহেতু বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের সময় তখনো ঠিক হয়নি, তাই আমার শিক্ষকেরা তখন আমাকে পরামর্শ দিলেন নরওয়ে যাওয়ার। আমার এমফিলের বিষয় ছিল বিশেষ শিক্ষা।

সেখানে অভিজ্ঞতা কেমন হলো?
মাহবুবুর রহমান: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে শুরুতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। ভিনদেশ, নতুন পরিবেশ, বরফের ওপর হাঁটা, একা রান্না করে খাওয়া—নবজাতকের মতো আমাকে নতুন করে সবকিছু শিখতে হয়েছিলো। ছোটবেলা থেকেই আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি, চ্যালেঞ্জ নিয়েইতো এটুকু পথ এলাম। এরপর নরওয়ের দিনগুলো সুন্দর কাটল।

বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ পেলেন কবে?
মাহবুবুর রহমান: এর মধ্যে দেশে আসতে হয়েছিল। বিসিএসের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা দিতে হয়েছে। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতেই হয় কারণ যোগদানের প্রক্রিয়া যখন শুরু হলো, তখন আমি দেশেই। কারণ, এমফিলের অংশ হিসেবে দেশে উপাত্ত সংগ্রহের কাজ করছিলাম।

Related Posts
1 of 21

সিলেটের চুনারুঘাট সরকারি কলেজে যোগ দিই ২০১৬ সালে। University of Oslo এর তখনো একটি সেমিস্টার অসম্পন্ন ছিল। চুনারুঘাটের কর্মস্থলে ৬-মাস কাটানোর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করি Semester সম্পন্ন করার জন্য ছুটি পাই। এরপর এসে যোগ দিই সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজে।

আপনি পড়াশোনা করেছেন কোথায়?
মাহবুবুর রহমান: আমাদের বাড়ি সিলেটে।শৈশবে আমাকে স্থানীয় এক হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়েছিল। এরপর ১৯৯৫ সালে আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে আমার স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল ঢাকার মিরপুর ১৪ নম্বরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে।

তারপর মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই ২০০০ সালে। তখন সিলেটে সমন্বিত অন্ধ শিক্ষা প্রকল্পের অধীনে কোন স্কুল ছিল না। মৌলভীবাজারের বিদ্যালয়ে ছিল।

আমাদের দেখভাল করার জন্য একজন শিক্ষক ছিলেন। এ কারণেই সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। তারপর ২০০৫ সালে SSC পাস করি সেই স্কুল থেকে। মানবিক বিভাগ থেকে আমার রেজাল্ট ছিল জিপিএ–৪.৮৮।

উচ্চ মাধ্যমিক কোথায় পড়লেন?
মাহবুবুর রহমান:সিলেট জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হই; এটি আমাদের বাসার কাছেই। ২০০৭ সালে GPA–4.40 পেয়ে আমি উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করি। আমরা কোচিং সেন্টারে কোচিং করতে পারতাম না।

আমি বিভিন্ন কোচিং থেকে লেকচার শিট সংগ্রহ করতাম। সেগুলো আমার বোনেরা রেকর্ড করে দিত আর আমি শুনতাম। একজন শ্রুতলেখকের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম । ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তির সুযোগ পাই। আমি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই।

পরিবারে আর কে আছেন?
মাহবুবুর রহমান: আমার মা-বাবা ও ছোট তিন বোন। তাঁদের কারণেই আমি আজ এতটা পথ আসতে পেরেছি।

শৈশবেই কি চোখের আলো হারিয়ে ফেলেন?
মাহবুবুর রহমান: আমার জন্মের কিছুদিনের মধ্যে আমার মা-বাবা বুঝে ফেলেন, আমার চোখে সমস্যা আছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা এমন একজন শিশুকে নিয়ে কিছুটা কষ্ট পেলেন কারণ তখন তারা তরুণ।।

কিন্তু ভেঙে পড়লেন না। আমি শৈশবে নিজেকে যখন বুঝতে পারতাম না, ততদিন পর্যন্ত কোন সমস্যা ছিল না। যখন আমি বাইরে গেলাম, অন্যদের সাথে খেলতে গেলাম তখন বুঝলাম; আমি অন্যদের চেয়ে আলাদা। যারা ক্রিকেট কিংবা ব্যাডমিন্টন খেলছে, আমি তো তাদের সঙ্গে খেলতে পারছি না।

আমার বেশির ভাগ সময় কাটত আমার বড় ভাইদের সঙ্গে গল্পগুজব করে। তখনও আমি সৃজনশীল কিছু করতে পারছিলাম না। কিন্তু আমার আম্মু খুবই বুদ্ধিমতী। আমার বিকেল যেন ভালো করে কাটে সেজন্য তিনি আমাকে আবৃত্তির ক্লাসে, গানের ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কিন্তু তারপরও একটা পার্থক্য তৈরি হলো।

সে পার্থক্য ঘোচাতেই কি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কাজ করছেন?
মাহবুবুর রহমান: অনেকটা সে কারণেই। তাঁদের নিয়ে আমি বেশ কিছু গবেষণার কাজ হাতে নিয়েছি। তাঁদের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজছি, অনুসন্ধান করছি।

ভয়েস ওভার, ভয়েস অ্যাকটিংসহ এমন কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অনায়াসে ভালো করতে পারেন। আমি আমার মেধা-শ্রম দিয়ে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি, তাঁদের এগিয়ে নিতে তা প্রয়োগ করব, তাঁদের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব।

গঙ্গাপদ্মা শিল্পীগোষ্ঠী কী ধরনের কাজ করে?
মাহবুবুর রহমান: গঙ্গাপদ্মা শিল্পীগোষ্ঠী শ্রুতিনাটক তৈরি করছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়া তোলার কাজ করছি আমরা।

এই মানুষদের কর্মক্ষেত্র সীমিত। আমরা তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে সমাজের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তাই রেডিও ও টিভিগুলো যেন আমাদের নাটক নেয়, তারই চেষ্টা করছি।

*নাটকগুলো আপনারা কীভাবে নির্মাণ করেন?
মাহবুবুর রহমান: নাটক নির্মাণের পথটাও আমাদের জন্য মসৃণ নয়। লিখিত কোনো চিত্রনাট্য সরাসরি আমাদের কাজে আসে না। আমাদের কর্মীরাও একেকজন দেশের একেক প্রান্তে থাকেন। তাই হোয়াটসঅ্যাপে তাঁদের নির্দেশনা দিতে হয়। তাঁরাও তাঁদের অভিনীত অংশ রেকর্ড করে পাঠায় সম্পাদনার জন্য।

এরপর আমি মূল নাটকটি দাঁড় করাই। আমরা বেশ কিছু নাটক তৈরি করেছি। একটি নাটক এবিসি রেডিও ৮৯.২ এফএমে প্রচারিত হয়েছে।
তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো (6th December, 2015)

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More