প্রেম করে পা.লি.য়ে বিয়ে, হে.রে গে.লেন হাবিবা

প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে, হেরে গেলেন হাবিবা

প্রেম করে ভালোবাসার মানুষটিকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু সেই ভালোবাসা কাল হবে সেটা কার জানা ছিল। বিয়ের তিন মাস যেতে না যেতেই তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন তার হাতেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে জগৎ-সংসার ছাড়তে হলো তার।

বলছিলাম নওগাঁর গৃহবধূ হাবিবার কথা। যৌতুকের দাবিতে অমানবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ হাবিবা দীর্ঘ আট মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা গেছেন। মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে নওগাঁ শহরের দক্ষিণ হাট-নওগাঁ মহল্লয় গৃহশিক্ষক বাবা হাফিজুর রহমানের বাড়িতে মারা যান তিনি।

মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারকে বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ। বাদ আসর জানাজা শেষে তার মরদেহ নওগাঁ সরকারি গোবরস্থানে দাফন করা হবে বলে নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।

নির্যাতনের ঘটনায় হাবিবার বাবা হাফিজুর রহমান বাদী হয়ে নওগাঁ সদর মডেল থানায় তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলার পর ছেলে অভি ও তার বাবা শামসুজ্জোহা খানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে হাইকোর্ট থেকে শামসুজ্জোহা খান জামিনে আছেন বলে জানা গেছে। তবে ঘটনার পর থেকে আজও ছেলের মা সৈয়দা তাহমিনাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ শহরের দক্ষিণ হাট-নওগাঁ মহল্লার হাফিজুর রহমানের মেয়ে হাবিবা খাতুনের সঙ্গে একই মহল্লার শামসুজ্জোহা খান বিদ্যুতের ছেলে তামভি হাসান অভির প্রেমের সম্পর্ক হয়।

হাবিবা নওগাঁ পিএম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির ছাত্রী। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি, অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ এবং ২০১৫ সালে জেলা মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে।

২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট হাবিবা স্কুলে আসার নাম করে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যায়। পরে প্রেমিক অভিকে বিয়ে করে। বিয়ের পর থেকে হাবিবা বাবার বাড়ির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করত না।

কিন্তু বিয়ের তিন মাসের মাথায় হাবিবাকে বাবার বাড়ি থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলে অভির পরিবার। এত টাকা হাবিবার বাবা গৃহশিক্ষক হাফিজুর রহমানের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। এ নিয়ে হাবিবাকে প্রায় নির্যাতন করত স্বামী ও তার পরিবারের লোকজন।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিকেলে হাবিবার বাবার কাছে খবর পাঠানো হয় তার মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে। কিন্তু ছেলের পরিবার ওদিন হাবিবাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জীবিত বলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে।

এর চারদিন পর অচেতন হাবিবাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় স্বামী বাড়ির লোকজন। মেয়েকে দেখতে হাবিবার পরিবার রাজশাহীতে গেলে হাসপাতালে দেয়া ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর কয়েকজনের সহযোগিতায় প্রায় ছয়দিন পর রাজশাহীতে অভির এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে অচেতন হাবিবাকে উদ্ধার করা হয়।

পরে হাফিজুর রহমান তার মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখেন। নির্যাতনের শিকার হাবিবার মাথার পেছনে ও কোমরে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়।

সেই সঙ্গে নির্যাতনে ফলে দুইটি দাঁত ভেঙে যায় তার। খাবার দেয়া হয় নাক দিয়ে। কথা বলতে পারত না। শরীরের কোনো অংশই কাজ করত না তার। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকত। পরে এ অবস্থায় হাবিবাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বলে চিকিৎসকরা।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নওগাঁ সদর হাসপাতালে আবারও হাবিবাকে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসার পর অর্থ সঙ্কটে পড়ায় হাবিবাকে বাড়িতে নিয়ে যায় তার বাবা। এতোদিন বাবার বাড়িতেই ছিল। দীর্ঘ আট মাস পর মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে মারা যায় হাবিবা।

সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মেয়ে হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন হাবিবার বাবা-মা। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তাদের। কান্নাও করতেও ভুলে গেছেন তারা। প্রতিবেশীরা এসে শেষ বারের মতো হাবিবার মরদেহটা দেখে যাচ্ছেন।

হাবিবার বাবা হাফিজুর রহমান বলেন, যৌতুকের জন্য আমার মেয়েকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল। চিকিৎসার পরও তার শারীরিক কোনো উন্নতি হয়নি। অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো তাকে। আমি এর ন্যায় বিচার চাই।

নওগাঁ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোরিকুল ইসলাম বলেন, সংবাদ পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারকে হস্তান্তর করেছে। মামলার মূল আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর ছেলের মা সৈয়দা তাহমিনাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান ওসি।