স্বামীর প্রেরণায় শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে প্রশাসন ক্যাডার হলেন তাসনিম

ফাইরুজ তাসনিম, প্রশাসন ক্যাডার, ৩৮তম বিসিএস।

৩৯তম বিসিএসে স্বাস্থ‍‍্য ক‍্যাডারে কর্মরত নারী চিকিৎসক ডাক্তার ফাইরুজ তাসনিম সম্প্রতি ৩৮তম বিসিএসে প্রসাশন ক‍্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় বেড়ে ওঠা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরীজীবী বাবা ফয়েজ আহমেদ খান ও গৃহিনী মা রোমানা আক্তারের জেষ্ঠ‍‍্য সন্তান ফাইরুজ তাসনিম মৌরী।

শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর রেখে চলা এই চিকিৎসক SSC ও HSC উভয় পরীক্ষায়ই গোল্ডেন এ+ সহ বোর্ড বৃত্তিও লাভ করেছিলেন। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল থেকে MBBS ডিগ্রি সম্পন্ন করা এ চিকিৎসক জানান, বাবা মায়ের ইচ্ছাতেই তার চিকিৎসাবিদ‍্যায় পড়াশোনা করা ।

অতঃপর চার্টার্ড সেক্রেটারি স্বামী জনাব তৌকির আহমেদ (দিপু) এর অনুপ্রেরণায় তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তার ভাষায় “মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা এবং দেশ ও জনগণের সেবা করার প্রত‍্যয় নিয়েই আমার ডাক্তারি পড়াশোনা করা।

তথাপি জন-মানুষের কল‍্যাণে আরও কাছাকাছি থেকে তাদের জন্য বৃহৎ পরিসরে নতুন কিছু করার তাগিদ থেকেই এই প্রসাশন ক‍্যাডারে আসা।”

বিসিএস পরীক্ষার এই পথচলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “BCS এর এই পথচলাটা এত সহজ ছিল না; যতটা আমি আশা করেছিলাম।” যদিও সফলতা বিষয়টি বড়ই আপেক্ষিক। তারপরও আজকে আমার BCS এর সফলতার জন‍‍্য যে মানুষটি নিঃসার্থভাবে তার শ্রম আর অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন, তিনি আমার অর্ধাঙ্গ, আমার বন্ধু, আমার স্বামী!!!

সত‍্যি বলতে, যাপিত জীবনের ফেলে আসা সময়টুকু বেশ কঠিনই ছিল আমার জন‍্য।

কারণ বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি আমি বরিশাল থেকে নিয়েছিলাম। আমার স্থায়ী ঠিকানা ঢাকা কিন্তু শ্বশুর বাড়ি ময়মনসিংহে হওয়ায় বরিশাল শহরে আমার পরিবার পরিজন বলতে তেমন কেউই ছিল না। পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশান ট্রেনিং ও রোগি দেখার পাশাপাশি একসাথে ৩৮ ও ৩৯ তম বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া আমার জন‍্য কষ্টসাধ্য ছিল।

সেই কঠিন সময়ে আমার স্বামীকে পাশে পেয়েছি অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে, আমার সব সাহস আর মানসিক দৃঢ়তার উৎস ছিলেন তিনি।

তিনি আমার জন‍্য রাত জেগে অনলাইন টিউটোরিয়াল সংগ্রহ করে রাখতেন, যেন সকালে উঠে আমি তা পড়তে পারি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ‍্যমে আমার দরকার হবে এমন যত শিক্ষামূলক পোস্ট থাকতো সব কপি করে রাখতেন তিনি। আমার পেশাগত সকল অনলাইন বই তার ছুটির দিনে প্রিন্ট করে রাখতেন, যেন আমার এতটুকু সময় নষ্ট না হয়।

আমার মনে হয়, বরিশালে আমার চেয়ে বেশি বিসিএস সংক্রান্ত বই এর কালেকশান খুব কম মানুষেরই ছিল।

Related Posts
1 of 21

কারণ বিসিএস সংক্রান্ত বইয়েরর সকল প্রকাশনীর প্রত‍্যেকটি বই, তিনি আমার জন‍্য প্রতি বছর নতুন করে কিনতেন। সময় সল্পতায় কত বই আজও ছুঁয়েও দেখা হয়নি!!!

নীলক্ষেত এর বইএর দোকানিরা শেষেরদিকে বই বিক্রি করতে ইতস্তত বোধ করতো, কারন বই কিনে কুরিয়ার করে বরিশালে পাঠানোর পর প্রায়ই দেখা যেত; বিক্রিকৃত বই এর দুই এক কপি তিনি আগেই আমার জন‍্য কিনে রেখেছেন!! রাতে একা পড়তে ভালো লাগতো না বলে যত রাত পর্যন্ত আমি পড়তাম ততরাত পর্যন্ত উনি জেগে থাকতেন।

ভাইবার আগে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ভয়ে আতকে উঠি!! দৈনিক ১৩টা করে প্রেসারের ঔষুধ খেয়েও যখন শেষ রক্ষা হলো না, ১০দিনে আমার ওজন কমলো ১১কেজি, হায়েস্ট ডোজ-এ এন্টিহাইপারটেনসিভ নেয়ায় ড্রাগের সাইড এফেক্টে সারা রাত দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে

আর নাম ঠিক করে রাখা অনাগত পুত্র সন্তান কে হারানোর কষ্টে আমি তখন ছিলাম পুরোই দিশেহারা। নিজের পুরো নামটাও সঠিকভাবে মনে করতে কষ্ট হতো ,সেই সময়ও উনিই আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছিলেন।

ডেঙ্গুর ভয়ে আর আমার গাইনিকলোজিস্ট এর পরামর্শে ফুল বেডরেস্টে থাকাকালীন সময়, শুয়ে শুয়ে পড়ার জন‍্য উনি আমার জন‍্য ছোট্ট একটি টেবিল নিয়ে এসেছিলেন যেন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হলেও দুই এক লাইন পড়তে পারি।।

তখন আমি এমন একটা সময় পার করছিলাম যে, বেঁচে থাকাটাই আমার কাছে চ‍্যালেঞ্জ মনে হতো; সেখানে ভাইবা দেয়ার কথা ভাবাটাও যেন ছিলো বিলাসিতা। কারণ ঔষধের সাইডইফেক্টে গুছিয়ে শুদ্ধ করে একটা বাক‍্য বলার ক্ষমতাও সেদিন হারিয়ে ফেলেছিলাম।

হাত-পা আর চোখ এতটাই ফুলে গিয়েছিলো যে, চোখ খুলে তাকাতে কষ্ট হতো। চিন্তা করে একটা বাক‍্যও শুদ্ধ করে বলার ক্ষমতাটাও সেদিন হারিয়ে ফেলেছিলাম, যেখানে ভাইবা হচ্ছে নিজের সেরাটা দিয়ে বোর্ডকে ইমপ্রেস করার পরীক্ষা । সারা রাত ব্যাথায় চিৎকার করতাম,নিজে নিজে বিছানা থেকে উঠার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিলাম।

এই মানুষটি সেই সময় প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে। এমনকি আমাকে সেবা করা ও সময় দেয়ার জন‍্য টানা প্রায় চার মাস তার সমস্ত পেশাগত কাজ বন্ধ রেখেছিলেন শুধুমাত্র অসুস্থতার জন্য !

এমনকি ভাইবার আগের রাতেও আমি প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখনো আল্লাহ্ তাআলার কাছে একটাই চাওয়া ছিলো, আমি যেন সুস্থভাবে ভাইবাতে অংশগ্রহণ করতে পারি!! হাই ডোজে ব‍‍্যাথার ঔষধ খেয়ে সেদিন আমি ভাইভা দিতে পেরেছিলাম,

আলহামদুলিল্লাহ্।ভাইবার সেই সময়টুকু সৃষ্টি কর্তা আমাকে সত‍্যিই সুস্থ রেখেছিলেন। যার ফলাফল হিসেবে ৩৮ তম বিসিএসে প্রশাসন ক‍্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।

বিসিএস এর প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন- “বিসিএস হচ্ছে এক দীর্ঘ অদেখা অন্ধকার Tunnel এ যাত্রা। যার শুরুটা আশা ও সম্ভাবনার আলোয় উজ্জ্বল হলেও, শেষটা কী হবে তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ থাকে না!!

চরম প্রতিযোগিতামূলক এই সময়ে সফলতার জন‍্য একজন প্রার্থীকে যে কত নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়, আর কতশত ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়, তা সেই প্রার্থী ছাড়া অন্যকারো পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব না। কোন প্রার্থী যদি নিজের মধ‍্যে প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি, মেধা আর ধৈর্য্য; এই ৩টির সমন্বয় সাধন করতে পারেন তবে তার জন‍্য সাফল‍্য অবশ‍্যম্ভাবী।

প্রথমত, ২০০ মার্কের প্রিলির প্রিপারেশান নিতে এখন আগের বিসিএসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি পড়াশোনা করতে হয়। সেক্ষেত্রে কয়েকটি প্রকাশনীর বইয়ের সিরিজ প্রথমে একবার পড়ে নিতে পারলে ভালো হয়। পড়ার পাশাপাশি মডেল টেস্ট থেকে

এমসিকিউ পরীক্ষা দিলে পড়াটা অনেক বেশি কার্যকর হয়। ইংরেজির প্রস্তুতির জন‍্য English for competitive exam বইটি অনেক বেশি কার্যকর। গণিত নিয়মিত চর্চা করতে হবে। বিগত বছরের প্রশ্ন ও মিনি জব সলু‍‍উশান পড়লে অল্প সময়ে অনেকটুকু পড়া হয়।

রিটেনের জন‍্য আসলে Residual নলেজ অনেক বেশি কাজে দেয়। Reading Habit আর লেখার দ্রুততার উপর লিখিত পরীক্ষার Result অনেকটাই নির্ভর করে। সাম্প্রতিক বিষয়াবলীর উপর স্বচ্ছ ধারনা প্রার্থীকে চাকরির পরীক্ষায় অনেকটাই এগিয়ে রাখে।

ভাইবা, ভাগ‍্য আর পরিশ্রমের উপর অনেকটাই নির্ভর করে। তাই নিজের সেরা Version টা অধিকতর চর্চার মাধ‍্যমে উপস্থাপন করতে পারাটাই, ভাইবা বোর্ডে ভালো করার অন‍্যতম উপায়। সাড়ে তিন বছরের বিসিএসের যাত্রায় নিজেকে motivated রাখাটাই বড় পরীক্ষা।

ভবিষ্যৎ সিভিল সার্ভেন্টদের বিসিএস-এ পাশ করার আগে, ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশ করতে হয়। নিয়মিত রুটিন মাফিক পড়াশোনা ও চর্চাই কাঙ্খিত বয়ে আনতে পারে কাঙ্খিত সাফল্য। সকলের জন‍্য রইলো শুভকামনা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More