বিরল রোগে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে বিপাকে অসহায় পরিবার!

বিরল রোগে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে বিপাকে অসহায় পরিবার!

আবদুর রব। বয়স ১০। ওজন মাত্র ৫ কেজি। লম্বা ২৭ ইঞ্চি (দেড় হাত)। সম বয়সী অন্য শিশুদের মতো সে পারে না হাঁটতে, খেলতে বা দাঁড়াতে। এমনকি বসতে ও নিজ হাতে খেতেও পারে না। কথা বলাও শেখেনি এই বয়সে। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ১০ বছরেও যেন আটকে আছে ৬ মাস বয়সে। অবশ্য মুখে দাঁত আছে। হাসতে পারে আবদুর রব। চকলেট খাওয়ানোর কথা বললে হেসে দেয় সে। যদিও হাসির বিনিময়ে সব সময় চকলেট মেলে না তার ভাগ্যে।

মা-বাবা ও একমাত্র বোনের সাথে সম্প্রতি মিরপুর চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসেছিল আবদুর রব। যদিও এই ভ্রমণের কোনো আনন্দ তাকে হয়তো স্পর্শ করেনি। তবুও মা-বাবার চেষ্টার কমতি ছিল না। চিড়িয়াখানাতে নয়া দিগন্তের প্রতিবেদকের সাথে দেখা ও কথা হয় আবদুর রবের মা-বাবার।

রুলেখা ও তৈয়ব দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে আবদুর রব ছোট। এই দম্পতির প্রথম সন্তান তহুরা আক্তার বৃষ্টি (১২)। বৃষ্টি আশুলিয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু পরিবারের সব আনন্দ মাটি হয়ে গেছে ছেলে আবদুর রবকে নিয়ে।

আবদুর রবের মা রুলেখা বেগম (২৮) জানান, এমনিতেই অভাবের সংসার। স্বামী তৈয়ব আলী (২৯) ক্ষুদ্র পান-সিগারেটের দোকানি। দোকান থেকে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় হয়। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চার সদস্যের পরিবার একটি ছোট রুম ভাড়া নিয়ে থাকেন আশুলিয়ায়। মাসে ভাড়া দিতে হয় আড়াই হাজার টাকা। বাকি টাকায় সংসারের খাই-খরচ টেনেটুনে চলে যায়। কিন্তু অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য প্রতিমাসে প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। নিয়মিতই এই চিকিৎসা করাতে হয়।

ছেলের চিকিৎসার খরচ কোথায় পান- জানতে চাইলে চোখের পানি শাড়ির আঁচলে মুছে মা রুলেখা বলেন, ‘ভাই, আমরা গরিব মানুষ। কী আর করবো? কেউ তো গরিব-অসহায় মানুষের খবর রাখে না। বাধ্য হয়ে মানুষের কাছে হাত পাতি। সব সময় তো টাকা পাওয়া যায় না। যখন যা পাই তা দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাই। সন্তান। ফেলে তো দেয়া যায় না। যতদিন আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখবেন এভাবেই হয়তো চলতে হবে!’

স্বামী তৈয়ব আলী বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর মান্দা উপজেলায়। ২০০৭ সালে আমাদের বিয়ে হয়। দু’বছর পর প্রথম সন্তান বৃষ্টির জন্ম। এর দু’ছর পর আমাদের সংসারে আসে ছেলে আবদুর রব। মেয়ের পর ছেলে। খুব খুশি হই আমরা। কিন্তু ছেলেটি জন্মের মাত্র পাঁচ দিন পর স্ট্রক করে। মুহূর্তেই সব আনন্দ মাটি হয়ে যায়। সেই থেকে প্রায় ১০ বছর ধরে অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে অভাবের সংসার চলছে।

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে রুলেখা ও তৈয়ব বলেন, ডাক্তার বলেছেন- যতদিন বেঁচে থাকবে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। আর এভাবেই থাকবে। শরীরিক বৃদ্ধি হবে না ছেলেটির। রুলেখা আক্ষেপ করে বলেন, ‘মা-বাবা হিসেবে আমাদের কী বা করার আছে! আমরা আল্লাহর উপরেই সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি!’

তৈয়ব আলী বলেন, সরকারি সাহায্য পাওয়া তো আমাদের কপালে জুটবে না। ধনী ব্যক্তিরা যদি একটু সুদৃষ্টি দিতেন তাহলে হয়তো ছেলেটার নিয়মিত চিকিৎসা করানো সহজ হতো।

কেন সরকারি সাহায় পাবেন না- জানতে চাইলে তৈয়বের উল্টো প্রশ্ন, ‘সরকারি অফিসে দৌড়া-দৌড়ি আর ঘুষ ছাড়া কি সাহায্য পাওয়া যায়?’

রুলেখা ও তৈয়ব আলীর প্রত্যাশা, সন্তানের চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তবানরা যেন একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এতে অসংখ্য কষ্টের মাঝে হয়তো কিছুটা প্রশান্তি ফিরবে তাদের পরিবারে।

Related Posts
1 of 151
Published 

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More