ইমামকে ফাঁসাতে ভাগ্নিকে ধর্ষণ করে ফেঁসে গেলেন মামা-মামি

ইমামকে ফাঁসাতে ভাগ্নিকে ধর্ষণ করে ফেঁসে গেলেন মামা-মামি

Related Posts
1 of 151

কক্সবাজারে জমির বিরোধ নিয়ে মসজিদের ইমামকে ফাঁসাতে ভাগ্নিকে ধর্ষণ করে উল্টো ফেঁসে গেলেন মামা-মামি ও এক ইউপি সদস্য। তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার বিচক্ষণতায় মূল ঘটনা বেরিয়ে আসায় শ্রীঘরে ঠাই হলো ধর্ষক মামা এবং সহায়তাকারী মামি ও ইউপি সদস্য। মামিকে মা সাজিয়ে ধর্ষণ মামলাটিও সাজানো হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে পুলিশি তদন্তে। এ ঘটনায় পুরো কক্সবাজার জুড়ে চলছে তোলপাড়।

মাওলানা মো. ফরিদুল আলম। তিনি কক্সবাজারে পেকুয়ার মগনামা ইউনিয়নের মুহুরীপাড়া গ্রামের কবির আহমদের ছেলে এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভোজপুর হাজিরখিল হাজী আব্দুল ওয়াহাব জামে মসজিদের পেশ ইমাম। তার সঙ্গে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিলো নুরুন্নবীর। তিনি একই গ্রামের নজির আহমদের ছেলে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে থানা আদালত ও ইউনিয়ন পরিষদে একাধিক মামলা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত মাওলানা ফরিদকে ফাঁসাতে ভিন্নপন্থা অবলম্বন করে নুরুন্নবী।

ফরিদের অভিযোগ, পেকুয়ার মগনামার ৫ নম্বর ওয়ার্ড়ের ইউপি সদস্য আলমগীরের পরামর্শে নানান ফন্দি তৈরি করতে থাকে নুরুন্নবী। শেষ পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া নিজের বোনের মেয়েকে ধর্ষণ করে। আর এই ধর্ষণের দোষ আমার ঘাড়ে চাপায়। এমন অভিযোগে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৩ জুলাই আমার বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা করে। মামলায় ধর্ষণের শিকার শিশুর মায়ের নাম লতিফা বেগম ব্যবহার করা হয়। বাদী করা হয় ধর্ষকের স্ত্রী আমিনা বেগমকে।

সদর মডেল থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করে তদন্তের ভার দেয়া হয় এসআই আবুল কালামকে। এরপর তিনি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে তদন্ত শুরু করেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুর সঙ্গে কথা বলে সন্দেহ হয়। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকারকে জানাই। তার নির্দেশে তদন্তের সময় প্রথমে যে ঘটনাস্থল দেখানো হয়েছে তার আশপাশে খবর নিয়ে দেখি কেউ এই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত নয়। কক্সবাজার শহরের টেকপাড়ায় খোরশেদ আলমের বাড়িতে ঘটনাস্থল দেখানো হলেও তদন্তে দেখা যায় সেখানে কোনো ঘটনা হয়নি। এরমধ্যে জানতে পারি মামলার বাদী ধর্ষণের শিকার শিশু কন্যার মা নয় মামি। অথচ মা হিসেবে মামলা দায়ের করা হয়।

১৬ জুলাই রাতে শিশু, তার মা, ভাই-বোন, মামা-মামি ও কয়েকজন প্রতিবেশীকে থানায় জিজ্ঞাসা করি। পরদিন সকালে শিশু ও তার মাকে আদালতে জবানবন্দির জন্য পাঠিয়ে বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরে আদালত তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করে।

জবানবন্দিতে ধর্ষণের শিকার শিশু আদালতে জানায়, ৩ জুলাই রাত। মামা নুরুন্নবী, মামি আমিনা বেগমসহ মগনামা ইউনিয়ন এর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলমগীরের বাড়িতে বেড়াতে যায়। রাত আড়াইটার দিকে মামি আমেনা বেগম প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ঘরের বাইরে গেলে, নিজ মামা নুরুন্নবী মুখ চেপে ধরে তাকে ধর্ষণ করে। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসে। মামা-মামি তাকে শিখিয়ে দেয়, সে যেন পুলিশকে বলে মাওলানা ফরিদই তাকে ধর্ষণ করেছে।

ধর্ষণের শিকার শিশু কন্যাকে হাসপাতালে রেখে মামা নুরুন্নবী ও মামি আমিনা বেগম থানায় যায়। আমিনা বেগম নিজেকে লতিফা বেগম দাবি করে টিপ স্বাক্ষর দিয়ে মামলা করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, টিপসই এর নিচে মোবাইল নাম্বার দেয়া হয় ইউপি সদস্য আলমগীরের।

ধর্ষণের শিকার শিশু কন্যা স্থানীয় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী দিদারুল আলম জানান, স্কুলের বিভিন্ন অভিভাবক সমাবেশে ধর্ষণের শিকার শিশুর মা আসেন। স্কুলের সব কাগজপত্রে তিনি স্বাক্ষর করেন। অথচ সদর মডেল থানায় ধর্ষণ মামলায় লতিফা বেগমের নাম দিয়ে আমেনা বেগম টিপসই দেন।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. খাইরুজ্জামান জানান, ১৯ জুলাই ধর্ষণের শিকার শিশুর মা লতিফা বেগম বাদী হয়ে নিজের ভাই নুরুন্নবী, ভাইয়ের স্ত্রী আমেনা বেগম ও তাদের নিজের এলাকার ইউপি সদস্য আলমগীরকে আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা করেন। পুলিশ সে মামলাটিও নথিভূক্ত করে উপ পরিদর্শক আবুল কালামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।

পুলিশ পরদিন এই মামলার প্রধান আসামি ধর্ষক নুরুন্নবী, ভুয়া বাদী তার স্ত্রী আমিনা বেগমকে গ্রেফতার করে। পরদিন আটক করা হয় এই মামলার আরেক আসামি পেকুয়া উপজেলার মগনামার ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলমগীরকে। তাদেরকে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ পরিদর্শক আবুল কালাম বলেন, প্রথম ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয়ে আমার সন্দেহ হয়। একমাত্র আসামি মৌলানা ফরিদ এর মোবাইল কল লিস্ট বের করে দেখা গেছে ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায় ছিলেন। তাছাড়া তিনি যে মসজিদে চাকরি করেন সে মসজিদের মতোয়াল্লীসহ কমিটির পক্ষ থেকে তিনি যে ঘটনার সময় তাদের মসজিদে ছিলেন তার একটি প্রত্যয়নও দেয়া হয়।

কক্সবাজার সদর মডেল সার্কেলের অতিরিক্ত এসপি আদিবুল ইসলাম বলেন, প্রথমে মামলা রুজু হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা কিছু বিষয় বুঝতে পেরে আমাকে অবহিত করেন। আমি তাকে বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করি। একজন প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই ভাগ্নিকে মামার ধর্ষণের ঘটনাটি তদন্তকারী কর্মকর্তার বিচক্ষণতায় উৎঘাটন হয়েছে।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, জমির বিরোধে একজন মসজিদের ইমামকে ফাঁসাতে এত বড় জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে এটা প্রথমে ভাবতে পারিনি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত এসপি মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন, ধর্ষণের শিকার শিশুর মা বাদী হয়ে মামলাটি করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করতে বলি। এরকম একটি জঘন্য ঘটনা উদঘাটনের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করার জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই জানানো হবে। যাতে অন্য তদন্তকারী কর্মকর্তারাও গুরুত্ব সহকারে তাদের উপর অর্পিত মামলার তদন্ত করেন। সে সঙ্গে আসল অপরাধীরা কোনোভাবে পার পাবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More