এএসপি আনিসুল হ,ত্যার এক বছর: বিচারের অপেক্ষায় বাবা

এএসপি আনিসুল হ,ত্যার এক বছর: বিচারের অপেক্ষায় বাবা

এএসপি আনিসুলকে হত্যার আগে অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট রুমে জোরপূর্বক ঢুকানো হয়/ছবি: হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া, ইনসেটে এএসপি আনিসুল
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম শিপন হত্যার বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছেন তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ। আনিসুলকে যারা হত্যা করেছেন তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তিনি।

গত বছরের ৯ নভেম্বর এএসপি আনিসুল করিম শিপনকে সিগারেট খাওয়ানোর কথা বলে মাইন্ড এইড হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট রুমে জোরপূর্বক তাকে ঢুকানো হয়। ওই রুমে নিয়ে তাকে উপুড় করে শুইয়ে আসামিরা দুই হাত পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধেন। বাঁধার সময় ঘাড়, মাথা, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এভাবে আনিসুল করিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

আলোচিত হত্যা মামলাটির ১৫ আসামির মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ছয় আসামি হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরই মধ্যে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। শিগগির চার্জশিটটি আদালতে দাখিল করা হবে বলে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ফারুক মোল্লা।

এ বিষয়ে আনিসুল করিম শিপনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ বলেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল ছিল শিপন। অসুস্থবোধ করায় তাকে চিকিৎসার জন্য মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। হাসপাতালের কর্মচারীরা আমার ছেলেকে হত্যা করে আমার সম্বল কেড়ে নিয়েছে। ছেলে হত্যার বিচারের আশায় পথ চেয়ে আছি। আমার ছেলেকে যারা হত্যা করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ফারুক মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সিনিয়র এএসপি আনিসুল করিম শিপন হত্যা মামলাটির তদন্তের কাজ শেষ হয়েছে। মামলার ১৫ আসামির মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছয়জন হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগির আদালতে চার্জশিট দাখিল করবো।’

গত বছরের ৯ নভেম্বর এএসপি আনিসুল করিম শিপন তার আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। হাসপাতালে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরদিন আদাবর থানায় আনিসুল করিম শিপনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফাইজুদ্দিন আহম্মেদ বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এর মধ্যে দুই আসামি পলাতক। তারা হলেন সাখাওয়াত হোসেন ও সাজ্জাদ আমিন।

Related Posts
1 of 151

মামলার আসামি মাইন্ড এইড হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, পরিচালক ফাতেমা খাতুন ময়না, মুহাম্মদ নিয়াজ মোর্শেদ, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন শেফ মো. মাসুদ, ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন, ফার্মাসিস্ট মো. তানভীর হাসান, ওয়ার্ডবয় মো. তানিম মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, মো. লিটন আহাম্মদ, মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ কারাগারে। মামলার একমাত্র আসামি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন জামিনে আছেন।

মামলায় আসামি কিচেন শেফ মাসুদ খান, ওয়ার্ডবয় অসীম চন্দ্র পাল, মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, সজীব চৌধুরী, হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মো. তানভীর হাসান ও ওয়ার্ডবয় মো. তানিম মোল্লা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

জবানবন্দিতে তারা জানান, ৯ নভেম্বর এএসপি আনিসুল করিম শিপনকে সিগারেট খাওয়ানোর কথা বলে মাইন্ড এইড হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট রুমে জোরপূর্বক তাকে ঢুকানো হয়। ওই রুমে নিয়ে তাকে উপুড় করে শুইয়ে তারা দুই হাত পিঠমোড়া করে বাঁধেন। বাঁধার সময় ঘাড়, মাথা, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করা হয়। এভাবে আনিসুল করিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

মামলার এজাহারে আনিসুল হকের বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার। আমার ছেলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হিসেবে কর্মরত ছিল। গত তিন-চারদিন ধরে হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়। পরিবারের সবার মতামত অনুযায়ী ছেলেকে চিকিৎসা করানোর জন্য গত ৯ নভেম্বর প্রথমে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাই।’

‘পরে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য একইদিন আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যাই। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরিফ মাহমুদ জয়, রেদোয়ান সাব্বির ও ডা. নুসরাত ফারজানা আমার ছেলে আনিসুল করিমকে হাসপাতালে ভর্তির প্রক্রিয়া করতে থাকেন। ওই সময় আমার ছেলে হাসপাতালের স্টাফদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করে। হাসপাতালের নিচতলায় একটি রুমে বসে হালকা খাবার খায়। খাবার খাওয়ার পর আমার ছেলে আনিসুল করিম ওয়াশরুমে যেতে চায়। বেলা পৌনে ১২টার দিকে আরিফ মাহমুদ জয় আমার ছেলেকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যায়। তখন আমার মেয়ে উম্মে সালমা আমার ছেলের সঙ্গে যেতে চাইলে আসামি আরিফ মাহমুদ জয় ও রেদোয়ান সাব্বির বাধা দেয় এবং কলাপসিবল গেট আটকে দেয়। তখন আমি, আমার ছেলে রেজাউল করিম ও মেয়ে ডা. সালমা (সাথী) নিচতলায় ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত ছিলাম।’

‘এরপর এজাহারে উল্লিখিতসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন আমার ছেলে আনিসুল করিমকে চিকিৎসার নামে দোতলার একটি ‘অবজারভেশন রুমে’ (বিশেষভাবে তৈরি করা কক্ষ) নিয়ে যায়। উক্ত আসামিরা আমার ছেলেকে চিকিৎসা করার অজুহাতে অবজারভেশন রুমে মারতে মারতে ঢুকায়। তাকে উক্ত রুমের ফ্লোরে জোরপূর্বক উপুড় করে শুইয়ে তিন-চারজন হাঁটু দ্বারা পিঠের উপর চেপে বসে এবং কয়েকজন আমার ছেলেকে পিঠ মোড়া করে ওড়না দিয়ে দুই হাত বাঁধে। কয়েকজন আসামি কনুই দিয়ে ছেলের ঘাড়ের পিছনে ও মাথায় আঘাত করে। একজন মাথার উপরে চেপে বসে ও আসামিরা সবাই মিলে পিঠ-ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি মেরে আঘাত করে।’

এজাহারে তিনি আরও বলেন, ‘এরপর বেলা ১২টার দিকে আমার ছেলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে, যা হাসপাতালে স্থাপিত সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে দৃশ্যমান। নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার পর আসামি আরিফ মাহমুদ জয় নিচে এসে আমাদের ইশারায় উপরে যাওয়ার জন্য ডাক দেয়। আমি আমার ছেলে ও মেয়েসহ অবজারভেশন রুমে গিয়ে ছেলেকে ফ্লোরে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পাই। অতঃপর জরুরি ভিত্তিতে ছেলেকে একটি প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More