ধর্মঘট-ভাড়াবৃদ্ধি: প্রতিকার চাইতে আদালতে যাওয়া যাবে

ধর্মঘট-ভাড়াবৃদ্ধি: প্রতিকার চাইতে আদালতে যাওয়া যাবে?

Related Posts
1 of 151

দেশে জ্বালানি তেলের দাম ২৩ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। এরপরই ভাড়া বাড়ানোর দাবিতে সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট ডাকে মালিকপক্ষ। এতে ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ জনগণ। এর মধ্যে গত শনিবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বন্ধ করে দেওয়া হয় লঞ্চ, যা ছিল ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

সবশেষ পরিবহন মালিকদের দাবির মুখে রোববার (৭ নভেম্বর) গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এরপর বাড়ানো হয় লঞ্চের ভাড়াও। ভাড়া বাড়ানোর পর ধর্মঘট তুলে নেন বাস-লঞ্চ মালিকরা। বিআরটিএ বলছে, এ বর্ধিত ভাড়া সিএনজিচালিত বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

অথচ গত কয়েকদিনে দেখা গেছে, ডিজেলচালিত বাসের পাশাপাশি সিএনজিচালিত বাসেও বাড়তি ভাড়া

 নেওয়া হয়েছে। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ জনগণ।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে রাজধানীতে অভিযানে নামছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১১ নভেম্বর) থেকে বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা এ অভিযানে অংশ নেবেন।

jagonews24

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—পরিবহন খাতে এ ধরনের নৈরাজ্য, হঠাৎ ধর্মঘট ডেকে মানুষকে জিম্মি ও জনগণকে দুর্ভোগে ফেলে দেওয়া, এসব নিয়ে আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে কি না। এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, এসব বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কিন্তু কে নেবে? এখন কেউ কি এগিয়ে আসতে চায়? তবে, প্রশ্নটা হলো প্রতিবারই তো এমন বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেন, এই বৃদ্ধিটার জন্য যারা ভুক্তভোগী তারা রিপ্রেজেন্টেশন দিয়েছে কি না, যে আমরা ভুক্তভোগী, দাম কমানো হোক বা আগের যে দাম ছিল সেটা নেওয়া হোক, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কেউ তো কোনো ডিমান্ড দাখিল করেনি। মনে হচ্ছে এটাতো সবাই মেনে নিয়েছে।

গণপরিবহন তো জনসম্পৃক্ত, তারা কি এভাবে ধর্মঘট ডেকে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলতে পারে—এমন প্রশ্নে সাবেক এই আইনমন্ত্রী বলেন, তাদেরও নিশ্চয় একটা কারণ আছে বা যুক্তি আছে। তারা (গণপরিবহন মালিক) হয়তো বলবে ভাড়া কম পড়ছে পোষায় না। কিন্তু এখন যারা ভুক্তভোগী যাত্রী, তাদের কিন্তু ওইভাবে কেউ নেই যে প্রতিকার চাইবে। তাদের পাওয়া যায় না। পরিবহন মালিকদের যুক্তি খণ্ডন করতে জনগণের পক্ষ থেকে ট্যাকেল দিতে পারতো কোনো পক্ষ।

jagonews24

‘পরিবহন শ্রমিক বা কর্মচারী যারা আছেন, তাদের বেতন বাড়িয়েছে কি না সেটাও দেখার বিষয়, না কি শুধু ভাড়া বাড়িয়েছে। তারা (চালক ও হেলপার) যদি অ্যাফেক্টেড না হয় তাহলে তো আর ডিমান্ড থাকবে না’—বলেন শফিক আহমেদ।

ধর্মঘট ও ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো প্রতিকার চাইতে দেশের আদালতে যাওয়ার সুযোগ ছিল কি না জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে বলছি, এটা আসলে কোর্টের নজরে আনা উচিত ছিল। যেহেতু এখানে পাবলিক ইন্টারেস্ট ইনভলবড। কারণ তেলের দাম এক লাফে ১৫ টাকা বাড়া—এটা সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয়।

তিনি বলেন, ধর্মঘট ডাকার বিষয়টি আদালতে নেওয়া উচিত ছিল, এর সময় এখনো আছে। উচিত ছিল এটা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (পিআইএল) করা।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, এই সেক্টরে তো সাধারণ মানুষের স্বার্থ বেশি। যারা অর্থশালী তাদের তো গাড়ি আছে। সরকারি চাকরিজীবী যারা, তাদেরও রয়েছে গাড়ি। যারা নিম্নআয়ের লোক, যারা সাধারণ মানুষ, যাদের আয় কম, তারা এখানে (বাসে) চলাফেরা করেন। সেখানে ডিজেলের মূল্য হঠাৎ করে হয়তো বাড়তে পারে। কিন্তু সেটা কতো বাড়ে। এই দাম বাড়ানোটা তো পার্মানেন্ট নয়। এটা তো কয়দিন পরই কমে যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের উচিত ছিল ভর্তুকি দেওয়া।

তিনি আরও বলেন, সাধারণত এসব বিষয় হ্যান্ডেলিং করেন মন্ত্রী। ভাড়া বাড়ানো, পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বসে এটা হ্যান্ডেল করতে হয়। কিন্তু আমরা দেখলাম যে, সরকার এটা বিআরটিএকে দিয়ে হ্যান্ডেলিং করালো।

jagonews24

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেছেন, তাড়াতাড়ি ধর্মঘট উঠে গেলেই তারা স্বস্তিতে থাকবেন। কিন্তু এখানে ধর্মঘট ডাকার উদ্দেশ্য কী সেটা তারা বিবেচনা করেননি।

তিনি আরও বলেন, সিএনজিচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর কথা নয়, কিন্তু সেটাও তারা বাড়িয়েছে। সম্ভবত ৫০ শতাংশ বাস সিএনজিতে চলে। একইভাবে লঞ্চ ধর্মঘট করে সেখানেও কিন্তু তারা ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছে। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়লো, সে অনুসারে ভাড়া কিন্তু বেশি বাড়ানো হয়েছে। এটা কেন করলো? করার অর্থ হলো করোনার সময় কিছুদিন বাস চালাতে পারেনি। তারা মনে (পরিবহন মালিক) করলো সেই লসের টাকা তুলে নেই। এখন অজুহাত দেখিয়ে তারা এটা আদায় করে নিলো। এ অজুহাত সব ব্যবসায়ী করেন। তারা সুযোগ বুঝে সরকারের কাছ থেকে নিয়ে নেন।

ধর্মঘট নিয়ে জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে আসার বিষয়ে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, উচ্চ আদালতে যে কেউ আসবে না এমন তো নয়। ঘটনা যেহেতু ঘটেছে, দেখেন যে কোনো সময় হয়তো কেউ না কেউ আসতে পারে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More